সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের দরপত্র ঘিরে নতুন করে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের চিত্র সামনে আসছে। গণপূর্ত, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর, পানি উন্নয়ন বোর্ড, সড়ক ও জনপথ, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল এবং শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের ভাষ্য, বিএনপি-জামায়াতপন্থি ও রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দিতে তাদের ওপর নিয়মিত চাপ ও তদবির আসছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে পছন্দের প্রতিষ্ঠান কাজ না পেলে বদলি ও হয়রানির হুমকিও দেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন তারা।
দেশের সড়ক, সেতু, কালভার্ট, বাঁধ, পানি সরবরাহ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন সরকারি স্থাপনার বড় অংশ বাস্তবায়িত হয় এসব প্রকৌশল সংস্থার মাধ্যমে। ফলে দরপত্র মূল্যায়ন ও ঠিকাদার নির্বাচনের ক্ষেত্রে মাঠপর্যায়ের প্রকৌশলী ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতা, কাগজপত্র কিংবা দরপত্রের নির্ধারিত যোগ্যতা পূরণ না করেও কোনো কোনো ঠিকাদারের পক্ষে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের তদবির আসছে। কখনো সরাসরি, আবার কখনো মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে পছন্দের প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়ার বার্তা পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পানি উন্নয়ন বোর্ডের এক নির্বাহী প্রকৌশলী বলেন, ❝আমরা কীভাবে কাজ দেব? কাগজপত্র না থাকলে কাজ দেওয়া যায় কি? বর্তমান ব্যবস্থায় নিয়মের বাইরে গিয়ে কাজ দেওয়ার সুযোগ নেই।❞
একই ধরনের পরিস্থিতির কথা জানিয়েছেন গণপূর্ত অধিদপ্তরের একজন প্রকৌশলী। তার ভাষ্য, একই কাজের জন্য একাধিক ব্যক্তিকে দিয়ে তদবির করানো হচ্ছে। কিন্তু দরপত্রের শর্ত পূরণ না করলে শুধু রাজনৈতিক সুপারিশের ভিত্তিতে কাউকে কাজ দেওয়ার সুযোগ নেই।
কয়েকজন প্রকৌশলী জানিয়েছেন, পছন্দের ঠিকাদার কাজ না পেলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে বদলির ভয় দেখানোর ঘটনাও ঘটছে। এতে একদিকে সরকারি ক্রয়বিধি অনুসরণের বাধ্যবাধকতা, অন্যদিকে রাজনৈতিক চাপ, এই দুইয়ের মধ্যে পড়ে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা প্রশাসনিক সংকটে পড়ছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর তথ্যমতে, কিছু রাজনৈতিক ব্যক্তির নিজেদের বা ঘনিষ্ঠজনদের ঠিকাদারি ব্যবসার সঙ্গেও সম্পৃক্ততা রয়েছে। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে কাজ পাইয়ে দেওয়ার বিনিময়ে আর্থিক সুবিধা বা কমিশন চাওয়ার বিষয়ও আলোচনায় এসেছে। এসব নির্দিষ্ট আর্থিক লেনদেনের তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
সরকারি ক্রয়ব্যবস্থায় নতুন বাস্তবতা
দেশের সরকারি ক্রয়ব্যবস্থায় ২০২৫ সালে বড় পরিবর্তন এসেছে। নতুন Public Procurement Rules (PPR), 2025 কার্যকর হয় ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫ থেকে। এতে জাতীয় পর্যায়ের পূর্তকাজে আগের ±১০ শতাংশ মূল্যসীমা তুলে দেওয়া, সব সরকারি ক্রয়ে e-GP বাধ্যতামূলক করা এবং কাজ পাওয়া প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত সুবিধাভোগীর পরিচয় প্রকাশের মতো পরিবর্তন আনা হয়েছে।
নতুন ব্যবস্থায় Significantly Low-Priced Tender (SLT) মূল্যায়নের ব্যবস্থাও e-GP-তে যুক্ত হয়েছে। নির্দিষ্ট ধরনের দরপত্রে অস্বাভাবিক কম মূল্য প্রস্তাব শনাক্ত ও মূল্যায়নের জন্য এই পদ্ধতি ব্যবহৃত হচ্ছে।
নতুন পিপিআরের ঘোষিত উদ্দেশ্যের মধ্যে রয়েছে সরকারি ক্রয়ে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, প্রতিযোগিতা এবং অর্থের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে নারী, ক্ষুদ্র ও নতুন উদ্যোক্তাদের সরকারি ক্রয়ে অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়ানোর ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
তবে মাঠপর্যায়ের প্রকৌশলীদের ভাষ্য, নিয়ম ও প্রযুক্তিগত কাঠামো পরিবর্তন হলেও রাজনৈতিক প্রভাবের চেষ্টা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। দরপত্র মূল্যায়নের সময় কোনো প্রতিষ্ঠানকে ‘রেসপন্সিভ’ বা ‘নন-রেসপন্সিভ’ বিবেচনা করার ক্ষেত্রেও প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন কয়েকজন কর্মকর্তা।
ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর এবং শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের ঢাকা অঞ্চলের কিছু দরপত্র নিয়েও সংশ্লিষ্ট মহলে প্রশ্ন উঠেছে। তবে এসব ক্ষেত্রে অনিয়ম হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট দরপত্রের নথি, কারিগরি মূল্যায়ন এবং ঠিকাদারদের যোগ্যতা পৃথকভাবে পর্যালোচনা প্রয়োজন।
প্রকৌশলীদের প্রশ্ন, দায় নেবে কে?
প্রকৌশলীদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ ভবিষ্যতের দায় নিয়ে। রাজনৈতিক চাপের মুখে নিয়মের বাইরে গিয়ে কোনো প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়া হলে প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়ম, নিম্নমানের কাজ বা আর্থিক ক্ষতির প্রশ্ন উঠলে নথিতে দায় থেকে যাবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারই।
এক প্রকৌশলীর ভাষায়, ❝কে কাকে সুপারিশ করেছেন, সেটি অনেক সময় নথিতে থাকে না। কিন্তু আমরা নিয়মের বাইরে গিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নিলে সেই সিদ্ধান্তের দায় শেষ পর্যন্ত আমাদেরই নিতে হবে।❞
এই পরিস্থিতিতে সরকারি উন্নয়নকাজে ঠিকাদার নির্বাচনের পুরো প্রক্রিয়া যোগ্যতা, প্রতিযোগিতা ও সরকারি ক্রয়বিধির ভিত্তিতে পরিচালনার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। একই সঙ্গে সাম্প্রতিক দরপত্রগুলোর স্বাধীন ও নথিভিত্তিক পর্যালোচনা হলে রাজনৈতিক প্রভাব, পক্ষপাত কিংবা প্রক্রিয়াগত দুর্বলতা কতটা রয়েছে, তার পরিষ্কার চিত্র পাওয়া সম্ভব।
কারণ সরকারি দরপত্রে কে কাজ পেলেন, বিষয়টি শুধু একজন ঠিকাদারের ব্যবসায়িক স্বার্থের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে রাষ্ট্রীয় অর্থের ব্যবহার, উন্নয়নকাজের মান, সরকারি প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহিতা এবং শেষ পর্যন্ত জনগণের স্বার্থ।
Admin